ইমলি দিদির বিয়ে - শ্রাবন্তী মিস্ত্রী

আমাদের মেসের মালকিন চাঁপা জেঠির মেয়ে ইমলি দিদি আমাকে একটু বেশিই বিশ্বাস করতো। চুপিচুপি আমার হাতে দশটাকা দিয়ে বলতো-"এটটা ক্যাডবেলি এনে দিবি ভাই?"

আমি এনে দিলে, এক টুকরো আমাকে হাতে দিতো। আমি বলতাম-"না দিদি তুমিই খাও।"

ইমলি দিদি কিন্তু আমি না খেলে ক্যাডবেরিটা মুখে তুলতো না। আমাদের মেসে কুড়িজন ছেলের সবাইকেই ইমলি দিদি ভালোবাসলেও আমাকে আলাদা চোখে দেখতো। আমি স্বভাবে ছোট থেকে শান্ত তাই যখন দেখতাম ইমলি দিদিকে সবাই খেপাচ্ছে, সবাইকে বারণ করতাম। ইমলি দিদি সব মেয়েদের থেকে আলাদা।  বয়স বাড়লেও সেই ছোটদের মতো দুদিকে বেনী করে ঘুরতো আর কথার স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারতো না। এই উচ্চারণের ভুলের জন্যই ইমলি দিদি কোনো কথা বললেই ছেলের দল হোহো করে হেসে উঠতো, কথাটা বারবার বলে ভ্যাঙাতো আর তখন ইমলি দিদি রেগে যেতো। ইমলি দিদির সাথে মজা করলেও কিন্তু সবাই ইমলি দিদিকে ভালোবাসতো। মাসের পর মাস বাড়ি থেকে দূরে থাকা ছেলে গুলোর ঘরে ঘরে যখন ইমলি দিদি বাটি বাটি পুলি পিঠে, নারকেল নাড়ু, পাটিসাপটা দিয়ে যেতো তখন সবাই আহ্লাদে নাচতে নাচতে ইমলি দিদির বিনুনি নাড়িয়ে বলতো-"ইমলি দিদি তুমি বড্ড ভালো।"

প্রত্যেক রাখী পূর্ণিমায় দিদি আমাকে এক টাকা দামের কুড়িটা রাখি কিনে আনার আদেশ দিতো, তারপর ঘরে ঘরে গিয়ে পরম মমতায় রাখী পরাতো আমাদের, সাথে দিতো নিজের হাতে তৈরি সন্দেশ। আমরাও ইমলি দিদির জন্য নিয়ে আসতাম চুড়ি, কানের দুল বা গলার হার যেগুলো পেয়ে ভীষণ খুশি হতো সে।


আমি তখন কলেজের ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র, নামী কলেজে পড়ার জন্য গ্ৰামের ছেলে এসেছিলাম শহরে আর থাকার জন্য খুঁজে নিয়েছিলাম ইমলি দিদিদের মেস বাড়িটা। তিনতলা বাড়ির ওপরের তলা গুলোতে থাকতাম আমরা, আর নীচে ইমলি দিদি থাকতো তার মায়ের সাথে। ইমলি দিদি একটু আলাদা হওয়ায় ওর কোনো বন্ধু ছিল না, তাই বিকেল হলেই ও চলে আসতো ছাদে আমাদের একটু সঙ্গ পাওয়ার আশায়। ইমলি দিদি তেমন লেখাপড়া জানতো না বটে তবে আমাদের পরীক্ষা আছে জানলে আমাদের কপালে ঠাকুর পূজো করে চন্দনের টিপ লাগিয়ে দিতে ভুলতো না। এমনকি রুমে কারো শরীর খারাপ হলে তারজন্য আলাদা পুষ্টিকর খাবারও বানিয়ে আনতো সে।


বয়স হয়েছিল চাঁপা জেঠির মৃত্যুর পর বাপ মা হারা মেয়ের কি হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তাও করতো খুব, তাই সবসময় মেজাজ থাকতো খিটখিটে। মায়ে মেয়েতে মাঝে মাঝে তাই ঝগড়া লাগতো়। আমাদের সিনিয়র দাদাদের থেকে শুনেছি স্বাভাবিক না হওয়ায় নাকি অনেক চেষ্টা করে পণ দেবেন, গয়না দেবেন, বলেও চাঁপা জেঠি নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে পারেননি। চাঁপা জেঠি আর ইমলি দিদির সংসার চলতো মাসে মাসে আমাদের ভাড়া দেওয়া টাকায়। ইমলি দিদি খেতে খুব ভালোবাসতো তাই মায়ের থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে টাকা এনে আমায় দিয়ে বলতো খাবার আনতে। অন্যদের দিতে ভয় পেতো, পাছে কেউ জেঠিমাকে বলে দেয়! 


আমার ছিল ভোরবেলায় উঠে পড়ার অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠে ছাদের এক কোণে বসে পড়তাম, কখনো হাঁটতে হাঁটতে পড়া মুখস্থ করতাম। ভোরে পুরো বাড়ি একেবারে শান্ত, কুড়িজনের হৈ হল্লা মুক্ত থাকায় পড়ায় মনোযোগ আনতে সুবিধা হতো। রোজ সকালে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম সকালের শান্ত প্রকৃতি। ঠিক ভোর সাড়ে পাঁচটায় বেজে উঠতো সাইকেলের বেল আমাদের মেস বাড়ির সামনে। সেই শব্দে ছুটে যেতো ইমলি দিদি রাজু দার হাত থেকে খবরের কাগজ আর দুধের প্যাকেট নিতে। রাজু দা পাশের চায়ের দোকানে কাজ করে, আর সকালে খবরের কাগজ দুধের প্যাকেট পৌঁছে দেয় বাড়ি বাড়ি, চা খেতে গিয়েই আলাপ রাজুদার সাথে। আমি দেখতাম দুজন দুজনকে দেখে হাসছে। কতোবার দেখেছি ইমলি দিদি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে যতোক্ষণ রাজু দাকে দেখা যায়, রাজুদাও হোঁচট খেতে খেতে পিছন ফিরে ইমলি দিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতো। এই ভালোলাগা টা ভীষণ পবিত্র, যেখানে রূপ গুনের চুলচেরা বিশ্লেষণ নেই, রয়েছে শুধু দুটো সরল মনের পবিত্র বন্ধন। আমি যা দেখতাম কখনো কাউকে বলতাম না বেশ উপভোগ করতাম ব্যাপারটা। 


একদিন সকালে দেখলাম বেল টা বারবার বাজাচ্ছে রাজুদা। নীচে উঁকি দিয়ে দেখলাম আজ ইমলি দিদি যায়নি সেখানে, মনে পড়ে গেল ইমলি দিদির তো জ্বর। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে জিনিস গুলো দরজার সামনে রেখে মন খারাপ করে রাজুদাকে চলে যেতে দেখে আমারও মনটাও খারাপ হয়ে গেল। বেলায় দিদির জ্বর কমেছে দেখে কলেজে গেলাম আমি। পরের দিন সকালে পড়তে ইচ্ছে করছিল না ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। হঠাৎ বেজে উঠলো সাইকেলের বেলটা, দুর্বল পায়ে বেরিয়ে এলো ইমলি দিদি আজ দেখলাম রাজু দা খবরের কাগজের সাথে হাতে ধরিয়ে দিল একটা সদ্য ফোটা লাল গোলাপ। ইমলি দিদিকে দেখে বুঝলাম বেশ লজ্জা পেয়েছে সে। না বলা ভালোবাসাটা দিনের পর দিন বাড়তেই লাগলো।


তখন আমি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছি। সেদিন রাতে ইমলি দিদির কান্না শুনে ঘুম ভেঙে আমরা সবাই নীচে গেলাম। গিয়ে দেখলাম চাঁপা জেঠি শরীর খুব খারাপ। সেই রাতেই আমরা জেঠিকে নিয়ে ছুটলাম হাসপাতালে। হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ভর্তি থাকার পর একদিন মৃত্যু সংবাদ পেলাম জেঠিমার। সেদিন ইমলি দিদির পরিবারের তেমন কেউ ওর পাশে না থাকলেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা কুড়িজন ছেলে জেঠিমার মৃত্যু পরবর্তী সব কাজ শেষ করেছিলাম। ইমলি দিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা।


এর পর গোটা একটা বছর কেটে গেছে ইমলি দিদি চরম একাকিত্বে ভোগে বুঝি আমি, কখনো কখনো মায়ের ছবির সামনে বসে কাঁদে। আমরাই দিদির বাজার করে দিই। এখনো রোজ সকালে  রাজু দা আসে এখনো ওরা পারেনি মনের কথা বলতে। আমার ফাইনাল ইয়ার চলছে কদিন পর চলে যেতে হবে, ইমলি দিদিকে নিয়ে বেশ চিন্তা হয় আমার। সেবার নিজে থেকে আমি গিয়ে রাজু দার সাথে আলাপ করলাম। রাজু দা খুব ভালো লোক, কোনো রকম নেশা করে না, বস্তির ছোট একটা ঘুপচিতে একাই থাকে। নিজে লেখাপড়া না জানলেও লেখাপড়া জানা লোকেদের সম্মান করে প্রচুর। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম-"বিয়ে করোনি কেন রাজু দা?"

উত্তরে বলেছিল-"নিজের পেট টেনেটুনে চলে, আর একটা মেয়ের ভালো রাখার সামর্থ্য নেই ভাই।"

-"কাউকে ভালো লাগে?"-কথাটা জিজ্ঞেস করতেই মুখ দেখে মনে হয়েছিল লজ্জা আর ভয় দুটোই পেয়েছে রাজু দা।


সেবার বিকালে মন দিয়ে একটা গান শুনছিলাম, হঠাৎ চিৎকার করে কান্না শুনলাম ইমলি দিদির। গিয়ে দেখলাম ফাস্ট ইয়ারের একটা জুনিয়র ছেলে ইমলি দিদির বিয়ে নিয়ে ঠাট্টা করায়, দিদির চোখ দিয়ে জল ঝরছে। আমি জুনিয়র ছেলেটাকে একটু রাগী গলায় বললাম-"যা এখান থেকে।"

ও চলে গেল। একমাস পর আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা আমাদের ইয়ারের নজন মেস ছেড়ে চলে যাবো, তার আগে ইমলি দিদির জন্য কিছু একটা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি। কিন্তু এই ঘটনার পর মনে হল আর দেরি করা ঠিক হবে না। মেসের সব ছেলেকে বললাম-" আজ সন্ধ্যায় মিটিং হবে আমাদের ঘরে সবাই যেনো থাকে সেখানে।"

ইমলি দিদিকেও থাকতে বললাম সেখানে।

সন্ধ্যায় আমরা কুড়ি জন ছেলে এক হলাম। সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল ব্যাপারটা জানার জন্য। আমি রাজু দা আর ইমলি দিদির ব্যাপারটা সবাইকে বললাম। এটাও বললাম যে দিদি আমাদের এতো ভালোবাসে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদেরই ভাবতে হবে। একজনকে বললাম ইমলি দিদিকে ডেকে দিতে। ইমলি দিদি আসতেই শান্ত গলায় বললাম-" আমাদের তুমি নিজের ভাই ভাবো তাই না? তাহলে এই ভাইদের কাছে একটা সত্যি কথা বলো রাজু দাকে ভালোবাসো তুমি?" কান্না চোখে সম্মতি জানিয়ে ইমলি দিদি ছুটে চলে গেল নিজের ঘরে। সেই রাতে আমরা সাত আটজন ছেলে রাজু দার সাথে বসে আলোচনা করলাম অনেক সময় ধরে। দুজনের সম্মতি নিয়েই আমরা ঠিক করলাম বিয়ের ব্যবস্থা করবো ওদের। যেহেতু আর তেমন কেউ ছিল না ইমলি দিদিদের পরিবারে আমরাই শুরু করলাম যাবতীয় আয়োজন। নির্দিষ্ট দিনে বিয়েও ঠিক হয়ে গেল।


সেদিন সকালে বিসমিল্লা সানাইয়ের সুর বেজে উঠলো আমাদের মেস বাড়িতে। কুড়িজন ছেলেকে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে সব কাজ দেখাশোনা করতে দেখা গেল। সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির মুন্নি এসে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিল ইমলি দিদিকে। আমরা কুড়িজন ভাই মিলে খাবার পরিবেশন করলাম, বর আনলাম এমনকি পিঁড়িতে বসিয়ে ইমলি দিদিকে সাতপাক ঘোরালাম। গোধূলি লগ্নে পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে বিয়ে হয়ে গেল ইমলি দিদির। তারপর আর মাস দেড়েক ছিলাম আমি মেসে। রোজ দেখতাম ভোর বেলা ইমলি দিদির হাতে বানানো চা খেয়ে খবর কাগজ আনতে যাচ্ছে রাজু দা। বেশ খুশি দেখাতো ওদের। মেস ছেড়ে যাওয়ার সময় কান্নাকাটি করেছিল খুব ইমলি দিদি, আমি বলেছিলাম আবার আসবো কিন্তু আসা হয়নি আর।

দীর্ঘ সাত বছর পর আজ আমি আবার এসেছি কাজের দরকারে সেই মফস্বলে। মেসবাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে গাড়িটা থামালাম আমি। মেসের সামনে দেখলাম চপ সিঙাড়ার এক রমরমে দোকান। দোকানে বসে আছে ইমলি দিদি আর রাজু দা। কথা বলতে ইচ্ছে করলো খুব। গাড়িটা একধারে পার্ক করে রেখে সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম ইমলি দিদির সামনে। ওমনি ইমলি দিদির মুখে খুশির ঢেউ খেলে গেল আমাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। প্লেট সাজিয়ে খেতে দিল চপ সিঙাড়া আর মিষ্টি। ছোট্ট একটা ছেলে দেখলাম ঘরে খেলছে আমাকে দেখিয়ে বললো আমার ছেলে এটা, দেখে খুব ভালো লাগলো। আমি একটা সন্দেশ মুখে দিয়ে বললাম তিনবছর ধরে এই সন্দেশ কতো খেয়েছি। এখনো জিভে জল আসে সামনে দেখলে। ইমলি দিদি হেসে বললো-" মনে আছে তোর ভাই?"

আমি বললাম-"দিদিকে কখনো কি কোনো ভাই ভুলতে পারে?"

ইমলি দিদির মুখে ফুটে উঠলো খুশির হাসি।

~: সমাপ্ত :~

Source : শ্রাবন্তী মিস্ত্রী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন